Saturday, June 20, 2015

দুবাইয়ে দেহব্যবসার শিকার এক নারীর করুণ কাহিনী

দুবাইয়ে দেহব্যবসার শিকার এক নারীর করুণ কাহিনী

দুবাইয়ে দেহব্যবসার শিকার এক নারীর করুণ কাহিনী
দুবাই, ০৭ জুলাই- সুরমার (ছদ্মনাম) বাড়ি কুষ্টিয়ায়। নারী শ্রমিক হিসেবে দুবাই গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে তাকে দিয়ে করানো হয় দেহব্যবসা। শুধু তাই নয়, দেশ ছাড়ার আগের রাতে বাংলাদেশি যে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত যান, সেই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনের পাশবিকতারও শিকার হন তিনি।
দুবাইয়ে গিয়ে প্রথমে তিনি আনোয়ার হোসেনের আত্মীয় সাইফুল ইসলামের পাশবিকতার শিকার হন। এরপর দেখা গেল কোনো শ্রমিক হিসেবে নয়, যৌনকর্মীর কাজ করতে হচ্ছে। শুক্রবার একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলেছেন সুরমা।
এর অাগে ১ জুলাই হতভাগ্য এ নারীকে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা নিয়ে ঢাকার একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর আদালত পল্টন থানাকে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
সাক্ষাৎকারে সুরমা বলেন, গত ৯ জুন তার দুবাইয়ে যাওয়ার দিন নির্ধারিত হয়। এর আগের দিন ৮ জুন মিনার ট্রাভেলসের মালিক আনোয়ার হোসেনের কথা মতো আমার স্বামী কবির হোসেনকে নিয়ে বিকেলে ফকিরাপুলে ওই ট্রাভেল অফিসে যাই। সন্ধ্যার দিকে আনোয়ার আমার স্বামীকে বলেন, অনেক দূর থেকে এসেছেন, আপনি চলে যান। আপনার স্ত্রী এখানেই অন্যদের সঙ্গে থাকবে। বিদেশে যাচ্ছে, ভাষাসহ আরও অনেক কিছু জানা দরকার তার। কাল ফ্লাইট (৯ জুন, ২০১৪), রাতের মধ্যে এ সব শিখাতে হবে। আনোয়ারের কথায় চলে যান আমার স্বামী।
তিনি বলেন, রাতে তার (আনোয়ার) অফিসের একটি রুমের সোফায় আমাকে ঘুমাতে দেওয়া হলো। এ সময় অফিসে আর কাউকে দেখিনি। রাত ১১/১২টার দিকে আনোয়ার আমার কাছে এসে শরীরে হাত দেয়। আমি বাঁধা দিলে বলেন, বেশি কথা বলবে না। আমি যা বলি শোন। তুমি কি জান তোমাকে কত কষ্ট করে ওখানে পাঠাচ্ছি। একটা ভিসা করতে কত কষ্ট হয়? কত টাকা খরচ হইছে তোমার পিছে?
সুরমা বলেন, আমি তাকে বলি, টাকা তো আমরা আপনাকে দিয়েছি। আপনার কিসের খরচ অইছে? আনোয়ার তখন বললেন, তোমার টাকা তো দালাল সব খেয়ে ফেলেছে। আমি তখন বললাম, আমার বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই। আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তখন আনোয়ার বলেন, ঠিক আছে শুয়ে থাক। এর কিছুক্ষণ পর আনোয়ার আমার মুখ চেপে ধরে জোর করে আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করলেন আর বললেন, কথা বলবি না। তোকে বিদেশে পাঠাচ্ছি কি এমনি এমনি? এ সব করতে হবেই। আমাকে মারধরও করলেন। বলতে বলতে ঝরঝর করে কাঁদেন সুরমা।
তিনি বলেন, পরদিন আমাকে দুবাই পাঠিয়ে দেয় আনোয়ার। দুবাই বিমানবন্দরে নামার পর একটি লোক আমাকেসহ ১২-১৩ জনকে গাড়িতে করে সাইফুল নামে এক বাংলাদেশি দালালের অফিসে নিয়ে যায়। সাইফুল সম্ভবত সম্পর্কে আনোয়ারের শালা। ওই দেশের বাংলাদেশি দালাল। আনোয়ারের মাধ্যমেই ওই দেশে সাইফুল মেয়েমানুষ নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়।
সুরমা বলেন, আমাকেসহ অন্য মেয়েদের সাইফুলের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন অফিসে মেয়েদের সাপ্লাই করে দেওয়া হয়। সাইফুল আমাকে বলল, এখন তো রাত হয়ে গেছে, কাল তোমার মালিকের কাছে তোমাকে বুঝিয়ে দেব। আমি বললাম, আমি খুব ক্লান্ত, আমাকে একটু শুইতে দেন। অফিসের বাথরুমের কাছে একটি বড় রুম আছে। ওখানে আমাকে পাঠিয়ে দিল। গভীর রাতে সাইফুল আমার শরীরে হাত দিল। আমি বাধা দিয়ে বললাম, দেশেও আনোয়ার আমার ওপর অত্যাচার করেছে। আপনি আমার বাপ হন। দোহাই আমার উপর দয়া করেন। সে বলল, তুমি এখান থেকে বেরিয়ে বাঁচবে না। সাইফুলও আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করল।
চোখ বেয়ে অনবরত পানি পড়ছে তার। কেঁদে কেঁদেই বলে যেতে লাগলেন, সাইফুল সকালে নাইজেরিয়ান নাকি কোন দেশের এক দালালের কাছে ওই দেশের ১০ হাজার টাকায় বেচে দিল আমাকে। একটি গাড়িতে করে তিনতলা এক বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল। চারিদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখি ছোট ছোট কাপড় পরে কত মেয়ে বসে আছে। বাংলাদেশি এক নারী, সে নিজেকে সাইফুলের বউ পরিচয় দিয়ে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল। বলল, এখানে কেঁদে কোনো লাভ নেই। তোমাকে এ সব করার জন্যই আনা হয়েছে। যেহেতু সে বাঙালি তাই তাকে বললাম, আপনার স্বামী আমার উপর রাতে এই আচরণ করেছে। সে বলল, নো প্রবলেম। এ সব হয়েই থাকে। সাইফুলের বউ আমাকে নাইজেরিয়ান এক নারীর হাতে তুলে দিল। তারা সবাই মিলে আমারে একটা রুমে ঢুকিয়ে দেয়। দেখি ইয়া বড় বড় কালো কয়েকজন পুরুষ নেংটা হয়ে বসে আছে। আমি থাকতে চাইলাম না। তারা আমারে মারধর করতে করতে দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল। একে একে সবাই আমার উপর নির্যাতন চালাল। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। এভাবে ৮ দিন কিভাবে যে কেটেছে তা বলতে পারব না। তাদের কথা না শুনলে আমার উপর অমানুষিক নির্যাতন নেমে আসতো। তারা বলে, তোকে এত টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। এ সব তোকে করতেই হবে। ওখানে যে কয়েকদিন ছিলাম একটা দিন একটা সেকেন্ডও আমাকে শান্তিতে রাখেনি। এ কয়েকদিন ঠিক মত আমাকে খাবারও দেয়নি তারা। আমার জীবনটাই শেষ করে দিয়েছে। স্বামী আমার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কালাম পড়ে। সে কী আমাকে রাখবে? আমি কী তার কাছে থাকতে পারব?
সুরমা বলেন, ছোটবেলায় মা মারা গেছে। নানার কাছে বড় হইছি। নানা তার সম্পত্তি তিন খালার নামে লিখে দিছে। আমি তারে বলেছিলাম, আমি এতিম মানুষ, আমার কেউ নাই, এক কাঠা লিখে দাও। দেয়নি। আমি তখন বিদেশে যাওয়ার চিন্তা করি। অনেকেই তো যাচ্ছে, টাকা পয়সা আনছে। নানাকে বললাম, আমি বিদেশে যাব। টাকা কামাই করে জমি কিনে বাড়ি করবো। নানার ওপর জিদ করে আমি এই কাজ করছিলাম। আমি তো আর জানতাম না জীবনটা আমার শেষ হয়ে যাবে। আমি তাও জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি। ওখানে পাখি, সুমি, রাজিয়াসহ ৭ জন বাংলাদেশি মেয়ে আছে। ওদের কান্না দেখলে তো আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠবে। ওদের দিয়ে এ সব খারাপ কাজ করাইছে। ওখান থেকে আসমা নামে কুষ্টিয়ার একজন ফিরে আসছে।
এরপর সুরমা জানান তার ফিরে আসার রোমাঞ্চকর ঘটনা। বললেন, একজনের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে আমার স্বামীকে ফোন দিয়েছিলাম। সে ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে কথা বলে। ওই নরক থেকে সাইফুল ৮ দিন পর আমাকে তার অফিসে নিয়ে যায়। আমার সঙ্গেও পুলিশ কথা বলে। আমার স্বামী টাকা পাঠায়, তারপর আমাকে ফিরিয়ে আনে।
'আপনার সঙ্গে আনোয়ারের পরিচয় কীভাবে?' জানতে চাইলে সুরমা বলেন, আনোয়ারের সঙ্গে আমাদের কোনো চেনাজানা ছিল না। পরিচয় ছিল ধোলাইপাড়ের দেলোয়ার কালা দালালের সঙ্গে। সে আমারে আনোয়ারের মাধ্যমে দুবাইয়ে নিতে ক্লিনার ভিসা করে দেয়। সরকারিভাবে আমাকে এক মাস ট্রেনিংও দেয়। আমাকে সার্টিফিকেটও দেয়। সরকারিভাবে গেলাম, এরপরেও আমাকে বিক্রি করে দিল। আমার জীবন শেষ করে দিল। আমি বাঁচুম না। মরে যামু। আমার ছেলে মেয়ে হয় না। বাবা-মাও নাই। ভাই, এমন কিছু করেন যাতে ওরা মইরা যায়। ওরা আমাদের জীবনকে শেষ কইরা দিল।
এদিকে, মিনার এয়ার ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন তার বিরুদ্ধে আনীত সুরমার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমার অফিসে রাতে কোনো লোক থাকতে পারে না। থাকার কোনো নিয়মও নেই। রাত ৯টার পর অফিস বন্ধ থাকে। একদিন শুধু সে ফিঙ্গারিং করতে আমার অফিসে এসেছিল। এরপর আর আসেনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি মুসলমান, সেও মুসলমান। আমি একটা ব্যবসা করি, আমার ক্ষতি করে আপনাদের কোনো বেনিফিট নাই। পত্রিকায় উঠিয়ে কিছু ব্যবসা করতে পারবেন, এই তো। আপনারা বেশি না পেঁচিয়ে ওকে নিয়ে আসেন, মসজিদে ঢুকাইয়ে কুরআন শরিফ হাতে নিয়ে শপথ নেওয়ান, বিষয়টি সঠিক কিনা। এর বাইরে কোনো ফাংশনে যাবেন না। এ ছাড়া কেস কারবারে গেলে তো ভিন্ন কথা।
আনোয়ার বলেন, ওই মহিলার স্বামী কবির কী আসলে বিদেশ পাঠানোর জন্য এ সব করে নাকি মানুষকে ব্লেইম দিয়ে টাকা পয়সা উদ্ধারের চেষ্টা করে। ওই লোককে না দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন না। ওর হাজবেন্ড ঝালকাঠির আওয়ামী লীগের নেতা। এত বড় নেতা হয়ে তার ওয়াইফকে বিদেশ পাঠায় কেন?’ তিনি বলেন, আমাকে ব্লেইম দিয়ে চক্রান্ত করে টাকা নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে তারা। সঠিক তথ্য নেওয়ার থাকলে নেন। আর কোনো মহিলা ধর্ষণ হলে গোপন রাখতে চায়। সে এভাবে প্রচার করছে যে তার মানসম্মানও নাই। দরকার হলে আমি জেলে যাব তবে আমি আমার পথে সঠিক আছি।
একজন ধর্ষিত না হলে এ সব কী এমনি এমনি বলতে পারে এমন প্রশ্নে আনোয়ার বলেন, আপনিই চিন্তা করেন কেউ বলতে পারে কিনা। ওর তো গোপন রাখার দরকার ছিল। ৯ তারিখে পাঠাইছি ১৫ তারিখে ওর স্বামীকে ফোন করেছে, ২৭ তারিখে দেশে ফেরত আসছে। এ কয়েকদিনের মধ্যেই এত ধর্ষিত হয়ে গেল সে? আল্লাহই জানে কি হইছে।
আনোয়ার আরও বলেন, যদি সে ধর্ষিত হতো তাহলে তাকে ২২ হাজার টাকা দিয়ে দেশে আনতাম না, আমিও পালিয়ে থাকতাম।
দুবাইয়ে অবস্থানরত সাইফুল ইসলাম আপনার আত্মীয় কিনা জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, না, তিনি ওখানে ব্যবসা করেন। আদালত আপনাদের নামে মামলা নিতে পল্টন থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন, বিষয়টি জানেন কিনা? জানতে চাইলে আনোয়ার বলেন, এ ব্যাপারে কিছুই জানি না।
অন্যদিকে, মামলা এজহার হিসেবে গ্রহণ করতে আদালতের নির্দেশের কপি এখনও পল্টন থানায় পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন দুবাইফেরত ওই নারীর আইনজীবী বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের পর দুই দিন ছুটি, তাই আগামী রবিবার দুপুরের মধ্যে আদালতের অর্ডার থানায় পৌঁছবে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান কুষ্টিয়া সদরের হতভাগ্য ওই নারী। তিন দিনের মাথায় স্বামী কবির হোসেনকে ফোনে তার উপর নির্যাতনের কথা জানিয়ে দেন। পরে কবির পল্টন থানা পুলিশের মাধ্যমে মিনার এয়ার ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনকে চাপ দিয়ে সুরমাকে দেশে আনার ব্যবস্থা করানো হয়।  গত ২৭ জুন সুরমা দুবাই থেকে দেশে ফিরে আসেন। ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত ১ জুলাই তাকে রিলিজ দেয় চিকিৎসক। ডাক্তারী ছাড়পত্রে দুবাইফেরত সুরমা 'সেক্সুয়াল অ্যাসাল্ট'-এর শিকার বলে উল্লেখ করা হয়।
দুবাইয়ে পাচারের অভিযোগে মিনার এয়ার ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে গত সোমবার মামলা করতে যান ওই নারীর স্বামী। তবে পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন কবির। পরে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন বিশেষ দমন আদালত-১ এ মামলা করতে গেলে বিচারক এনামুল হক ভুইয়া পল্টন থানাকে সরাসরি মামলা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত যাদের নামে মামলা নেওয়ার নির্দেশ দেন তারা হলেন মিনার এয়ার ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনে, দেলোয়ার হোসেন, সাইফুল, মোতালেব হোসেন, সাঈদ হোসেন ও শেখ নিজামুল কবির (নিজাম)।

No comments:

Post a Comment