Saturday, June 20, 2015

প্রবাসে একান্নবর্তী পরিবার এক

প্রবাসে একান্নবর্তী পরিবার এক


প্রবাসে একান্নবর্তী পরিবার এক
আবুধাবি, ০৮ মে- বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, আবুধাবি আন্দোলনমুখী কোনো সংগঠন নয়। সেই অর্থে কোনো দাবি নিয়ে মানববন্ধনও এর কর্মসূচির আওতায় পড়ে না। তবে এক ধরনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যকে ধরে এর কর্মীদের যাত্রা, সে কথা ঠিক। নির্ভেজাল বিনোদন তাঁরা পছন্দ করেন। অন্যান্য বছরের মতো এবারও মহিলা সমিতির উদ্যোগে বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠান উদ্‌যাপন করা হয়। বাংলাদেশ ইসলামিয়া স্কুলে ২৪ এপ্রিলের এ আয়োজন ভিন্ন একটি মাত্রা দান করে। এতে গোটা পরিবেশ আকর্ষণীয় এক সৌন্দর্যে জ্বলে ওঠে।
মহিলা সমিতিকে একটি মঞ্চ বলেও উল্লেখ করা যেতে পারে। এর সদস্যরা সীমিত পরিসরে হলেও মানব সেবার বৃত্তি টিকেও এড়াতে চান না। তাইতো তাঁরা বাংলাদেশের গরিব শিশুদের মধ্যে লেখাপড়ার সামগ্রী বিতরণ করেছেন। কন্যা শিশুর পুষ্টিতে দুধের জোগান দিয়েছেন। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা কিংবা কারও কোনো জটিল অসুখে বাড়িয়েছেন সাহায্যের হাত।
নারীরাই সমিতির কেন্দ্রে। তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এর পরিচালনাও তাদের হাতে। সে কারণে এ মঞ্চকে তাদের মনের মাধুরী দিয়ে সাজানোর সুযোগ আছে। নেতা-কর্মীরা অবশ্য সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন। মহিলা সমিতির কোনো স্পনসর নেই। তবে তাদের আছে হৃদয় নিংড়ানো সদিচ্ছা। তাঁরা সংস্কৃতির চর্চা করেন। নিজেদের চাঁদায় তাঁরা সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থই তাদের আয়। এর পুরোটাই তাঁরা ব্যয় করেন। সে জন্য তাদের নেই কোনো সঞ্চয়।
বছরে দশটি অনুষ্ঠান করে থাকে এই সংগঠন। এর মধ্যে তিনটি পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে। বাকিগুলোতে থাকেন শুধুমাত্র নারীরাই। সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা বসে দূতাবাসে। এরা বছরে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেন পাঁচ তারকা হোটেলে। মূলত বিনোদন আর মুক্ত বিবেকে তাড়িত হয়ে তাঁরা এক জায়গায় বসেন। কখনো যুক্ত হন সমাজকর্মে।রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা

বৈশাখ বরণে তাঁরা অশেষ তৃপ্তি পেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ২৬০ জন। অনুষ্ঠানে ছিল দেশীয় পিঠা উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। এতে সভাপতিত্ব করেন জাকিয়া হাসনাত ইমরান।
এটা ছিল সত্যিই একটি উৎসব। আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান। তিনি নারীদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। বলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠানে দূতাবাস তার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক পপি রহমান বর্ষবরণকে বাঙালির প্রাণের উৎসব বলে বর্ণনা করেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন আঞ্জুমান আরা শিল্পী।
আয়োজনে ষড় ঋতুর ওপর গীতি-আলেখ্য নির্মাণ করা হয়। শুরুতে বৈশাখকে স্বাগত জানান শিল্পীরা। এসো হে বৈশাখ আহ্বানে তাদের আন্তরিক প্রকাশ পেয়েছিল ষোলো আনা। তারা মুগ্ধতা জানান দেশ মাতাকে। একি অপরূপ রূপে মায়ের কোমনীয়তাকে তুলে এনে তারা বিস্ময় ধরে রাখতে পারেননি। পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমার এ দেশ-এর প্রশংসায় তারা ছিলেন পঞ্চমুখ।
শিউলি তলায় ভোরবেলায় ঝাঁপি তার ভরে যায় ফুলে। সেই সে আনন্দ কী আর ভাষায় প্রকাশ করা যায়! সুন্দর সুবর্ণ লাবণ্য-ইত্যাকার প্রাণময় শব্দে তারা ব্যাখ্যা করেন সৌন্দর্যকে। অনুষ্ঠানে নৃত্যের সুষমা নিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়। সেখানে নৃত্যে কিশোর কিশোরীর ধান কেটেছে। গানে তারা মাইল্যা ভাই মাইল্যা ভাইকে ডেকেছে ফসলের খেতে। আনন্দে শিশুরা নাচবার অনুরোধ জানিয়েছে ঝুনজুন ময়নাকে। সাবরিনা সাহাবুদ্দিন রিপা ছোটদের নৃত্য পরিচালনা করেছেন। সুতরাং এ জন্য রিপাও ধন্যবাদ দাবি করতে পারেন। আয়োজনে যেমন খুশি সাজো পর্বটি সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে।

নারীরাই অংশ নিয়েছেন। তরুণী এক মা, কলেজ পড়ুয়ার রূপায়ণে অনবদ্য সেজেছেন। ভিখারি বেশে এসেছেন নিরু চুন্নু, ঘটক হয়ে আজমেরি শেলী, মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন জমিদার গিন্নির ভূমিকায় দিলরুবা সুমী। যাত্রার পুরোনো নায়িকা চরিত্রে রোকসানা সামাদকে বাস্তব থেকে আলাদা মনে হয়নি।
মাস্তান হয়ে এলেন শামীমা আক্তার মঞ্জু। দারুণ তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি! চাটগাঁর আধুনিক বউ শারমিন রিক্তা কি কম দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন? শুধু সাজে নয় সংলাপে জ্বলে উঠেছেন তাঁরা। অবস্থানগত পরিচয় তুলে ধরেছেন সবাই। শিল্পীতে সে উপস্থাপনাও উপভোগ করেছেন দর্শক।
অনুষ্ঠান আয়োজন সম্পর্কে মঞ্চের সদস্যরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করলেন। সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক নাশেতা নাহরির তানিয়া। তিনি বলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন সংগঠনের সদস্যরা। তারুণ্যই তাদের অনুপ্রেরণা-মন্তব্য তাঁর।
সংগঠনের নির্বাহী সদস্য সাজু মতিউদ্দিনের মুখে হাসি। তিনি তার ভালো লাগা প্রকাশ করেন। বলেন, অনুষ্ঠানটি ভালো করার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল তাদের।
নান্দনিক উপস্থাপনায় নাম কুড়িয়েছেন সুমনা রহমান। তারও মুখে তৃপ্তির রেখা। গোছালো একটি আয়োজনের অংশ হতে পেরে তিনিও যেন ধন্য। বলেন-খুবই উপভোগ্য এ অনুভূতি!
জাকিয়া হাসান এলি বলেন, বিদেশের মাটিতে বাঙালির সংস্কৃতিকে প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা একটি দায়িত্ব। সেই কাজটিই এই সংগঠন করে যাচ্ছে।
রেহেলী মুশফিক অনুষ্ঠানকে পুরোমাত্রায় উপভোগ করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার উপকরণ ঢাকা থেকে আনা হয়েছে বলে জানান। রাজধানী থেকে ঝুড়ি ভরে আনা হয়েছে রঙিন কাগজের পাখা, কলসি, সোলার তৈরি মঞ্চের সেট। এ ছাড়া বরের পাতিলে ভর্তি করে জোগান এসেছে খই, বাতাসা, চিড়া, মুড়ি. নাড়ু। অনুষ্ঠানের আগের দিন সাংগঠনিক সম্পাদক এনেছেন এসব সামগ্রী-সে তথ্যটিও বাদ রাখলেন না।

আয়োজনের সাফল্যে পেছনকার রহস্য জানতে ইচ্ছে করে। সাংস্কৃতিক সম্পাদক তার উদারতা দেখালেন বরাবরের মতোই। সবাই যার যার জায়গা থেকে সহযোগিতা করেছে বলেই এমন মন ভরা একটি অনুষ্ঠান উপহার দেওয়া সম্ভব হয়েছে-বলেন তিনি। এ সময় তার অক্সফোর্ড স্নাতকোত্তর কন্যা সুমাইয়া তাসনিম সুমী পাশে ছিলেন। বর্ষবরণে সুমীও গান গেয়েছেন। মহিলা সমিতির সদস্য সংখ্যা এক শ বা তার কাছাকাছি। পুত্র-কন্যা প্রিয়জন নিয়ে কখনো তাঁরা হয়ে ওঠেন আড়াই গুণ। এই সংগঠনের সবার মধ্যে একটি মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। নারীরা এখানে মুক্ত আলোচনা করেন কখনো। তাঁরা প্রাণখুলে বাতাস নেন হৃদ্‌যন্ত্রে।
সদস্যরা দেশজ সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করেন। সেটাকে জাগ্রত করে প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেন। তাঁরা ইতিবাচক কিছু একটা করার পরিকল্পনা করেন। সমাজ বান্ধব কর্মে যুক্ত হন। এক সঙ্গে এক তালে চলার চেষ্টা তাদের। এ কারণে মহিলা সমিতিকে একান্নবর্তী একটি পরিবার বললেও অত্যুক্তি হয় না।
তারুণ্যে দীপ্ত তারা। স্বতঃস্ফূর্ততা আছে তাদের। তারা আনন্দে কাজ করেন। এখানে তারা পান অন্যরকম পরিবেশ। নির্ভেজাল বিনোদন তাদের মনটা। এ জন্য সমিতিতে ভিন্ন ধরনের তৃপ্তি আর মুগ্ধতা প্রতিটি সদস্যের। এ কথা আলাপকালে যেমন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেন তেমনি সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
মহিলা সমিতি আনন্দময় আয়োজনের নিরলস যাত্রী। সদিচ্ছা আর স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে সে চলমান। ইতিবাচক তার দৃষ্টিভঙ্গি। প্রগতি আর আধুনিকতা-তার অবলম্বন। তার জয় হোক।

No comments:

Post a Comment